উইথ লাভ ইনকিলাব
২০১১ সালে পালাবদলের পর থেকেই শিক্ষক নিয়োগ-সহ বিভিন্ন সরকারী চাকরীর নিয়োগের পরীক্ষা অনিয়মিত হয়ে গিয়েছে। পরীক্ষা হলেও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম-বেনিয়মের চূড়ান্ত। ৩১শে জানুয়ারী ২০১৭ রাজ্য সরকার ও প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে ১১৩০০জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবক-যুবতীদের প্রাথমিক শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ করা হবে। ৭ই ফেব্রুয়ারী জানানো হয় যে প্রশিক্ষণহীনদেরও নিয়োগ করা হবে। অভূতপূর্ব ভাবে মেধাতালিকা প্রকাশ না করে সফল পরীক্ষার্থীদের SMS মারফৎ জানানো হয়। নিয়োগের ক্ষেত্রেও মানা হয়নি ১০০ পয়েন্ট রোস্টার, ১২০০-র বেশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় সফল হয়েও নিয়োগপত্র পায়নি, বহু পরীক্ষার্থী নিয়োগপত্র পাওয়ার পরেও চিঠি দিয়ে নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়া জুড়েই সীমাহীন দুর্নীতি ও স্বজনপোষণ। এর প্রতিবাদেই স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নিয়োগের দাবীতে বিগত ৯ই মার্চ SFI-DYFI পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির পক্ষ থেকে রাজভবন অভিযানের ডাক দেওয়া হয়েছিল।

নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে প্রশাসনিক অনুমতি নেওয়ার পরেও কর্মসূচীকে কেন্দ্র করে ছাত্র-যুব ও সাধারণ মানুষের মধ্যে উত্তাপ বাড়তে থাকে, নবান্নের নির্দেশে অভিযানের আগে পুলিশ বারবার করে কর্মসূচী বাতিল করতে অনুরোধ করে। নির্ধারিত সময় মেনেই ৯ই মার্চ দুপুর ২টোয় কলেজ স্কোয়ার-এ সংক্ষিপ্ত সভার মধ্য দিয়ে কর্মসূচী শুরু হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন SFI-এর রাজ্য সভানেত্রী কমঃ মধুজা সেনরায়। সভায় বক্তব্য রাখেন DYFI-এর রাজ্য সম্পাদক কমঃ জামির মোল্লা, রাজ্য সভাপতি কমঃ সায়নদীপ মিত্র ও SFI-এর রাজ্য সম্পাদক কমঃ দেবজ্যোতি দাস। ছোট্ট সভার পর রাজ্যের প্রত্যেক প্রান্ত থেকে আসা কয়েক হাজার ছাত্র-যুব মিছিল করে রফি আহমেদ কিদওয়াই রোড দিয়ে এগিয়ে চলে ধর্মতলার দিকে। ৯ই মার্চের কর্মসূচীর প্রচারের অংশ হিসাবে তার আগেই বিভিন্ন জেলায় স্বাক্ষর কর্মসূচী ও কুশপুতুল দাহ কর্মসূচী করা হয়। সেই সময়ে শিক্ষামন্ত্রীর কুশপুতুল চুরি করতে পুলিশের অতিসক্রিয়তায় সতর্ক হয়েই এদিন ছাত্র-যুবরা শিক্ষামন্ত্রীর কুশপুতুল পুলিশকে চুরি করতে দেয়নি।

ধর্মতলায় মিছিল পৌঁছনোর পর থেকেই পুলিশ বিভিন্ন ভাবে প্ররোচনা তৈরি করতে থাকে। পুলিশের প্ররোচনায় পা না দিয়েই ছাত্র-যুবরা শান্তিপূর্ণ ভাবেই ব্যর্থ শিক্ষামন্ত্রীর কুশপুতল খাটে তুলে জ্বালিয়ে দেয়। সভাপতি কর্মসূচীর সমাপ্তি ঘোষণা করেন। ছাত্র-যুবরা বাড়ির অভিমুখে ফেরা শুরু করতেই পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ে। মধ্যযুগীয় বর্বরতায় ৬/৭জন পুরুষ পুলিশ ছাত্র-ছাত্রীদের আক্রমণ করে। আহত হন ৩৬জন। SFI রাজ্য সভানেত্রী কমঃ মধুজা সেনরায়, DYFI রাজ্য কমিটির সদস্য কমঃ কলতান দাশগুপ্ত আহত হন। গুরুতর আহত হন কমঃ দেবারতি ভট্ট (দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলা) কমঃ প্রমা বল্লভ (কোলকাতা জেলা)-সহ অনেকে। দেবারতিকে রাস্তায় ফেলে ওর তলপেটে লাথি মেরেছে ৬জন পুরুষ পুলিশ। হাতের আঙুল মুচড়ে দিয়েছে। তলপেটে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়নি ওর এখনও। আঙুলের ভেন ও নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। SSKM হাসপাতালে ৪ ঘণ্টা ফেলে রেখে ভুল চিকিৎসা করা হয় দেবারতি-কে। আগামী ১৫ই মার্চ ওকে অস্ত্রোপচার করতে হবে। যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতেও কমরেডরা লড়াই ছাড়েনি, যতক্ষণ রাজপথে ছিল, স্লোগানে মুখরিত হয়েছে এসপ্ল্যানেড চত্বর। হাসপাতালে আহত ছাত্র-যুবদের দেখতে পৌঁছন SFI-এর প্রাক্তন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক কমঃ ডঃ সুজন চক্রবর্তী ও প্রাক্তন যুব নেতা তথা বিধায়ক কমঃ তন্ময় ভট্টাচার্য। কমরেড দেবারতির আঘাত গুরুতর, আশঙ্কা করা হচ্ছে ওর আঙুল বাদ যেতে পারে। অস্ত্রপ্রচারের জন্য ওকে নিয়ে যেতে হয়েছে ভেলোর।

রণংদেহী মনোভাব নিয়ে থাকা পুলিশের লাঠি ও বেধড়ক মারের মুখে দাঁড়িয়ে এ বাংলার যৌবন জানান দিয়েছে বাধা দিলে বাধবে লড়াই। ৬টি ভ্যানে টেনে-হিঁচড়ে পুলিশ নিয়ে গিয়েছে ছাত্র-যুবদের। গ্রেপ্তার হওয়া ছাত্র-যুবদের মধ্যে মধুজা সেনরায়, কলতান দাশগুপ্ত বা প্রমা বল্লভ-দের মতন অনেকেই তখন গুরুতর আহত। গ্রেপ্তার হয় SFI রাজ্য সভানেত্রী কমঃ মধুজা সেনরায়, রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য কমঃ অর্ণব বোস, কমঃ সোহম মুখার্জী, কমঃ সৌম্যজিৎ রজক, DYFI-এর রাজ্য সভাপতি কমঃ সায়নদীপ মিত্র, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমঃ ইন্দ্রজিৎ ঘোষ-সহ ১০২ জন ছাত্র-যুব। মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান, নদীয়া, হাওড়া, কোলকাতা, দুই ২৪ পরগণা-সহ বিভিন্ন জেলা থেকে কর্মসূচীতে যোগ দেওয়া ছাত্র-যুবদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয় লালবাজার সেন্ট্রাল লক-আপে। আহতদের চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় সরকারী হাসপাতালে। দেবারতি-কে ভুল চিকিৎসা করা, রশিদ ছাড়া ওষুধ এবং বাইরে থেকে এক্স-রে করতে বলা - সেখানেও অনিয়মের চূড়ান্ত।

লক-আপেও যেন নেই-এর রাজ্য। নেই পর্যাপ্ত কম্বল, জল, এমনকী মেডিক্যাল টেস্ট করতে আসা চিকিৎসকের কাছেও নেই প্রয়োজনীয় ওষুধ। প্রত্যেককে ব্যক্তিগত বণ্ডে জামিন পুলিশ দিতে চাইলেও ছাত্র-যুবরা ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করে। লক আপের দেওয়াল ভরে ওঠে শ্লোগানে শ্লোগানে আর নানা ছবিতে।  অথচ, পরের দিন তাদের মধ্যেই ৮জনের বিরুদ্ধে জামিন-অযোগ্য ধারায় মিথ্যা মামলা রুজু করলো হেয়ার স্ট্রীট থানার পুলিশ। ১০ই মার্চ দুপুরে ব্যাঙ্কশাল কোর্টের সামনেই কোলকাতা জেলা SFI, DYFI, AIDWA-র পক্ষ থেকে বিক্ষোভ কর্মসূচী করা হয়।১০ই মার্চ দুপুরে ব্যাঙ্কশাল কোর্টে গ্রেপ্তার হওয়া ছাত্র-যুবদের নিয়ে এলেও জায়গার অভাবের অজুহাত দেখিয়ে ছাত্র-যুবদের আদালতে হাজির করতে অস্বীকার করে পুলিশ। প্রিজন ভ্যান থেকেই ৯৪ জনকে মুক্তি দেওয়া হয়; বাকি ৮জনের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করে আদালতে তোলা হয় তাদের, ১৪ই মার্চ অবধি জেল হেফাজতের নির্দেশ দেয় আদালত। SFI রাজ্য সভানেত্রী কমঃ মধুজা সেনরায়, রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য কমঃ সোহম মুখার্জী, রাজ্য কমিটির সদস্য কমঃ সন্দীপন দাস, DYFI রাজ্য সভাপতি কমঃ সায়নদীপ মিত্র, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমঃ ইন্দ্রজিৎ ঘোষ-সহ ৮জনের জেল হেফাজত হয়। বাকি ৩জন ছাত্রী কমঃ অনন্যা নিয়োগী, কমঃ অহনা গাঙ্গুলী ও কমঃ রূপ্সা সাহা। ওদের অপরাধ একটাই – ওরা স্বচ্ছ নিয়োগের দাবীতে রাস্তায় নেমেছিল।

পুলিশী বর্বরতার প্রতিবাদে ১০ই ও ১১ই মার্চ রাজ্য জুড়ে বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচীর ডাক দেওয়া হয় ছাত্র-যুবদের পক্ষ থেকে। যাদবপুরে ৯ই মার্চ ও দুর্গাপুরে ১০ই মার্চ অবরোধ কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়। সারা রাজ্য জুড়ে রাস্তা অবরোধ, কুশপুতুল দাহ, প্রতিবাদসভা অনুষ্ঠিত করা হয়।
জেলে থাকা কমরেডদের সাথে দেখা করতে যান কমরেড ঋতব্রত ব্যানার্জী , কমরেড মানস মুখার্জি, কমরেড তন্ময় ভট্টাচার্য সহ আরও অনেকে। তাদের সাথে কারাবন্দি আট কমরেডকে দেখা করতে দেওয়া হয়নি।
১৪ ই মার্চ জামিনে মুক্ত হন ৮ জন কারাবন্দি কমরেড । এই দিন এক ঐতিহাসিক সমাবেশের সাক্ষী থাকে কলকাতা মহানগরী। সুবিশাল মিছিলের সাথে বিরাট জনসমাবেশ হয় ব্যাঙ্কশাল কোর্টের সামনে। সেখান কমরেডরা মুক্তি পাবার পর আবির খেলায় লাল হয়ে ওঠে কোর্ট চত্ত্বর। তীব্র শ্লোগানে মুহুর্মুহু মুখরিত হতে থাকে বাতাস। গানে, কবিতায়, নাচে আনন্দে মেতে ওঠেন সবাই।

14 March, 2017