অসম্ভবের ছন্দেতে

আরও একবার এসে গেলো ২রা এপ্রিল, আরও একবার ছোট ছোট কুঁড়িদের ফোটাবে বলে সুদীপ্ত-র ফিরে আসা।

২০১৩ সালে গার্ডেন রীচের হরিমোহন ঘোষ কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৃণমূল-আশ্রিত দুষ্কৃতীদের গুলিতে প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশকর্মী খুনের পরেই মাননীয়া রাজ্যের সমস্ত কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্র সংসদ নির্বাচন তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এইরকম অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্য জুড়ে ছাত্র-ছাত্রীদের অধিকার কেড়ে নেয় এ রাজ্যের সরকার। তার প্রতিবাদের ২রা এপ্রিল আইন অমান্য করতে গিয়ে পুলিশী হেফাজতে খুন করা হয় আমাদের রাজ্য কমিটির সদস্য কমঃ সুদীপ্ত গুপ্ত-কে, আহত হয় বহু কমরেড। মহানগরের পিচ-ঢালা কালো রাজপথ সেদিন লাল হয়ে গিয়েছিল সুদীপ্ত-র রক্তে। কিন্তু, সুদীপ্ত হারিয়ে যায়নি, সুদীপ্ত-রা হারিয়ে যায়না।

সুদীপ্ত-দের রক্তের বিনিময়ে ক্যাম্পাসগুলোতে গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে এনেছিলাম আমরা, মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছিল স্বৈরিণী। আজ আবার মনোনীত ছাত্র সংসদ চালু করার নামে ক্যাম্পাস থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের অধিকার লুঠ করতে চাইছে রাজ্য সরকার। নকশালবাড়ি কলেজ থেকে চাঁইপাট কলেজ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানেই ছাত্র-ছাত্রীরা ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে, সেখানেই খড়কুটোর মতো উড়ে গিয়েছে এ রাজ্যের শাসক দলের ছাত্র সংগঠন। তাই ওরা ভয় পেয়েছে। আর ভয় পেয়েছে বলেই ওরা চাইছে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে দিতে। কিন্তু, সুদীপ্ত-র কসম, ও অধিকার আমরা ওদের লুঠ করতে দেবো না কিছুতেই।

আমরা দেখছি আক্রমণ আজ বহুমুখী। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আক্রমণ নেমে আসছে স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকারের উপর, আক্রমণ নেমে আসছে মুক্তচিন্তার উপরেও। দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, হায়দ্রাবাদ থেকে হিমাচল কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, JNU-এ তো বটেই – প্রগতিশীল ছাত্র-ছাত্রী ও গবেষকদের দেশদ্রোহী তকমা দেগে দিতে উঠে পড়ে লেগেছে কেন্দ্রীয় সরকার, দোসর তার মেইনস্ট্রীম মিডিয়া। এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে উত্তর হতে পারে কেবলমাত্র ঐক্যবদ্ধ বাম ছাত্র আন্দোলনই। হিন্দুত্ববাদী শক্তির প্রতিবাদ করায় দেশের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়, একেবারে খোদ রাজধানীতে অবস্থিত JNU থেকে হাপিশ করে দেওয়া হলো স্নাতকোত্তর ছাত্র নাজিব আহমদ-কে। ১৫ই অক্টোবর থেকে সাড়ে ৫মাস সময় কেটে গেলেও আজ অবধি দিল্লী পুলিশ খুঁজে বের করতে পারেনি নাজিব-কে। অথচ, ছেলেকে খুঁজে বের করার দাবীতে পথে নামার অপরাধে পুলিশের হাতে মার খেতে হয় তার বৃদ্ধা মা-কে।

এ দেশে হায়দ্রাবাদ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে স্রেফ দলিত হওয়ার অপরাধে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয় মেধাবী গবেষক রোহিত ভেমুলা। সামাজিক বৈষম্যের ফলে দলিতরা তো বটেই, নিপীড়িত হচ্ছে সমাজের অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জাতি-উপজাতির ছাত্র-ছাত্রীরাও, যার চরম মূল্য চোকাতে হচ্ছে জীবন দিয়ে। দেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত অঞ্চলের ছাত্র-ছাত্রীদের উপর, কাশ্মীরী ছাত্র-ছাত্রীদের উপর জাতিগত আক্রমণের ঘটনা সমানে চলছে।

শুধু শারীরিক আক্রমণেই থেমে নেই ওরা। খুব সুকৌশলে দখল করতে চাইছে মগজটাকেও। আর তাই পাঠ্যসূচীতে থাকা দেশের ইতিহাসকে বদলে ফেলে যুক্ত করছে পৌরাণিক কাহিনীকে। গণেশের প্লাস্টিক সার্জারি বা পুষ্পক রথ পৃথিবীর প্রাচীনতম বিমান জাতীয় উদ্ভট তত্ত্ব খাড়া করা হচ্ছে। দীননাথ বাত্রার বই পড়ানো হচ্ছে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বদলে প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্র পড়ানো হচ্ছে। জ্যোতিষকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে ও আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ডিগ্রীও প্রদান করা হচ্ছে। শহীদ-এ-আজম কমঃ ভগৎ সিং-দের ইতিহাসের বইতে ‘সন্ত্রাসবাদী’ তকমা দেওয়া হচ্ছে। স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে তিতুমীরের “বাঁশের কেল্লা” গড়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে অসমসাহসী লড়াইয়ের ইতিহাস মুছে ফেলা হচ্ছে। এ রাজ্যেও আমরা দেখছি রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে সুকান্ত-র কবিতা বাদ দেওয়া হচ্ছে পাঠ্যসূচী থেকে। সিঙ্গুরে কারখানা গড়তে না দেওয়ার ধ্বংসাত্মক আন্দোলন শুধুমাত্র শাসক দলের নির্লজ্জ রাজনৈতিক প্রচারের অংশ হিসাবেই ঠাঁই পাচ্ছে পাঠ্যসূচীতে।

জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP) ও রাষ্ট্রীয় উচ্চশিক্ষা অভিযান (RUSA)-এর নামে শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রীকরণ করতে চাইছে দেশের সরকার। যাতে দেশ জুড়ে অভিন্ন পাঠ্যক্রম চালু করা যায়, শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও বেশী বেশী করে কর্পোরেট পুঁজির হাতে তুলে দেওয়া যায়, ও বিদেশে বাতিল হয়ে যাওয়া তৃতীয় শ্রেণীর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে টাই-আপ করে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বিকিয়ে দেওয়া যায় ভিনদেশীদের হাতে। লক্ষ্য, শিক্ষাব্যবস্থাকে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়া। এর বিরুদ্ধে “equitable access to quality education”-এর আমাদের দীর্ঘদিনের দাবীতে আন্দোলন চালিয়ে যেতেই হবে। শিক্ষা মৌলিক অধিকার, একে কেড়ে নিতে দেওয়া যাবেনা।

এই ধরণের বহুমুখী আক্রমণ থেকে এদেশের এবং আমাদের রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থাকে রক্ষা করতে, ক্যাম্পাসে ছাত্র-ছাত্রীদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে ফিরিয়ে আনতে ও অর্জিত অধিকারকে রক্ষা করতে সুদীপ্ত-র রক্তের শপথ নিয়েই লাখো সুদীপ্ত-র সাথে আমাদের দেখা হবে রাজপথে, আর ছোট ছোট কুঁড়িদের ফোটানোর সংগ্রামে সুদীপ্ত-দের জন্য, লক্ষ কোটি ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যে জয়ী আমাদের হতেই হবে। এ লড়াই বাঁচার লড়াই, এ লড়াই আমাদের জিততেই হবে।

দেখা হবে ২রা এপ্রিল সুদীপ্ত-র লড়াইয়ের ময়দান নেতাজীনগরেই।